সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গল্প: মা

 মায়ের উপর এক আকাশ রাগ নিয়ে চাচাতো বোন মারিয়া আপুর বাসায় চলে এসেছি সকালে।



মন খারাপ ঢেকে আপুর সঙ্গে আলাপ জমে যখন ক্ষীর, ঠিক তখন তার দেড় বছরের ছেলে মাহির কান্না করে উঠলো পাশের রুম থেকে। আপুর সঙ্গে আমিও দৌড়ে গিয়ে দেখি মাহির প্রস্রাব পায়খানা করে জামা কাপড় নষ্ট করে বসে আছে। 


আপু আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, 'ছেলেটা না ডায়াপার পরতে চায় না একদমই। পরালেই কান্নাকাটি করে।'


মাহিরের জামা কাপড় পরিবর্তন করে মাহিরকে আমার কাছে দিয়ে আপু ওয়াশরুমে গেলো নষ্ট হওয়া কাপড়গুলো পরিষ্কার করতে। 


অথচ এই মারিয়া আপুকেই দেখেছি, ছোট বাচ্চাদের থেকে দূরে থাকতে কোলে প্রস্রাব পায়খানা করে দিতে পারে এই ভয়ে। 


মাহিরকে কোলে নিয়ে আমি টিভি দেখছি। এমন সময় মা কল করলেন। ফোনের স্ক্রিনে মায়ের নাম্বারটা দেখেই গতকাল মায়ের বকুনিগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো। রাগটা আরও বেড়ে যেতেই ফোনটা বন্ধ করে দিলাম। কিছুক্ষণ বাদেই মারিয়া আপু চলে এলে আলাপ আবার জমে গেলো। আলাপের মাঝেই মাহিরের খাবারটা খাইয়ে দেয় আপু। 


খানিকক্ষণ যেতে না যেতেই মারিয়া আপুর গায়ে গড়গড় করে বমি করে দিলো মাহির। 


আপু চিন্তিত চোখে তাকিয়ে বললো, 'হয়তো বেশি খাওয়ানো হয়ে গিয়েছিলো।'


আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। আপু আগে মাহিরকে পরিষ্কার করে তারপর নিজে পরিষ্কার হয়ে এলো। আপুর মধ্যে একটুও ঘৃণা বোধ দেখতে পেলাম না। বরং দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিলো মাহিরকে নিয়ে।


অথচ বিয়ের আগে একবার আপুর গায়ে আমাদের পাশের বাড়ির ভাবীর দশ মাসের মেয়েটা যখন বমি করে দিয়েছিলো, আপু সেই জামাটা আর কখনো পরেইনি। ওইদিন রাতে খেতেও পারেনি কেবলমাত্র বমির কথা চিন্তা করে। 


আপুর বিয়ের পরে এ বাড়িতে এক দুইবার এসেছিলাম ঠিক কিন্তু এভাবে থাকা হয়নি। মাহিরের জন্মের পর আসিনি। মোবাইলে যোগাযোগ থাকলেও আপুর সঙ্গে খুব বেশি দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি। পড়াশোনার চাপে সময় হয়ে ওঠেনি। এবার মায়ের উপর রাগও জমলো আর সামনে বিশাল একটা বন্ধও পাওয়া গেলো। তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারতেই আপুর বাসায় চলে এলাম। বেড়ানোও হবে আর রাগেরও যাথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে। মা অবশ্য জানেন আমি এখানেই আছি।


এসেই আপুকে বলেছি, 'এবার কিন্তু এসেই বিদেয় হবো না। বেশ কিছুদিন থাকবো।'


আপু খুব খুশি হয়ে বললো, 'তুই চলে না গেলেই তো আমি খুশি।'


রাতে যখন সকলে খেতে বসলাম প্লেট একটা কম দেখে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপু তুমি খাবে না?'


আপু মাহিরের মুখে ভাতের লোকমা দিতে দিতে বললো, 'হ্যাঁ রে। মাহির তো এই পুরো ভাতগুলো খাবে না। ওর খাওয়া শেষ হলে আমি এই প্লেটেই খেতে বসবো।'


আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলাম আর নতুন এক মারিয়া আপুকে আবিষ্কার করতে থাকলাম। এই মারিয়া আপুকে কেউ কখনো ভালোবেসে নিজের প্লেট থেকে কিছু একটা তুলে দিতে চাইলে সে নিতো না, নিলেও তা খেতো না। কারণ অন্যের প্লেটের খাবারে তার ভক্তিটাই হতো না। আর  আজ সে মাহিরের নষ্ট করে রাখা খাবারটা পরম তৃপ্তি সহকারে খেয়ে নিচ্ছে। 


আপুর এই পরিবর্তনগুলো মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করার সুযোগটা মিলছে না।


রাতে আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি আপুর রুমে আলো জ্বলছে। সময় দেখতে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি দেড়টা বাজে। 


আপুর রুমে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করলাম, 'এখনো ঘুমাওনি?'


আপু শান্ত গলায় বললো, 'না রে মাহিরটা এখনো ঘুম পড়েনি। তাই জেগে আছি।'


তারপর আমায় প্রশ্ন করলো, 'তুই ঘুমাসনি কেন?'


'ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো।'


'আচ্ছা। এখন আবার ঘুমিয়ে পড় তবে। রাত জাগিস না, শরীর খারাপ করবে।'


আমি 'হুম' বলে বিছানায় এসে শুইয়ে পড়লাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। কিন্তু হঠাৎ মাহিরের কান্নার শব্দে আবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাত তিনটা৷ মাহির কেঁদেই চলছে। আপু মাহিরকে কোলে নিয়ে এ রুম থেকে ও রুমে হাঁটাহাঁটি করে চলছে। আপু নিজের ঘুম নিয়ে একটা কথা না বলেও বারবার মাহিরের শরীর খারাপ হওয়ার কথা চিন্তা করে চলছে। 


বারবার মনে হচ্ছে অন্য কোনো মারিয়া আপুকে দেখছি। তারপর আবার মনে হচ্ছে, না এই সেই মারিয়া আপুই যে চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে যাওয়ার ভয়ে রাত জাগতো না কখনো। 


মাহিরের কান্না থেমেছে। রুমে এখনো আলো জ্বলছে। আপু চুপচাপ মাহিরকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আপুর কাছে গিয়ে দাঁড়াই। 


আস্তে জিজ্ঞেস করি, 'এতোটা পরিবর্তন কিভাবে হলো?'


আমার কৌতূহলপূর্ণ প্রশ্ন শুনে আপু প্রশ্ন করলো, 'কোন পরিবর্তনের কথা জিজ্ঞেস করছিস?'


'আগের তুমি আর এই তুমি।'


কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থাকার পরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আপু বললো, 'একজন মেয়ে যখন একজন মা হয় তখন সে সন্তানের জন্য নিজের সবটা দিয়ে দিতে পারে। নিজের সব সুখ-শান্তি, ইচ্ছে-খুশি বিসর্জন দিতে রাজি থাকে। নিজেকে পুরোটাই বদলে ফেলার ক্ষমতা রাখে। আমি আর এ এমন কী বা করলাম!'


আমি চুপ করে কেবল আপুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আপুর কথাগুলো মস্তিষ্কের কোথাও গিয়ে আঘাত করছে বারবার।


আপু হেসে বললো, 'যা, এবার ঘুমিয়ে পড়। সকাল তো হয়ে এলো।'


রুমের আলো বন্ধ করে বিছানায় গা দিলাম কিন্তু অনুভব করলাম, চোখে ঘুম নেই। এপাশ ওপাশ করেই কেটে যাচ্ছে সময়, ঘুমের দেখা নেই। মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। আর বারবার চোখ জোড়া ভিজে আসছে। অস্থিরতায় ছেয়ে যাচ্ছে ভেতরটা।


সকালের সূর্যের আলো বিছানায় এসে পড়তেই যেন স্বস্তি পেলাম। 


মারিয়া আপু এসে বললো, 'উঠে পড়েছিস! শোন, আজ সকালে নাস্তা শেষ করে আমরা ঘুরতে বের হবো।'


আমি আপুর দিকে তাকিয়ে বললাম, 'অন্য একদিন তোমার সঙ্গে ঘুরতে বের হবো। আমি ফ্রেশ হয়েই চলো যাব।'


'কোথায় যাবি?'


'বাড়ি যাব।'


'তুই তো বললি এবার বেশ কিছুদিন থাকবি। তাহলে?'


'মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছে।'


আপু হেসে বললো, 'আচ্ছা। কিন্তু নাস্তাটা তো করে যাবি।'


'গতকাল সকালে নাস্তা না করেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছি। মা ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। আজ নাস্তাটা মায়ের সঙ্গে গিয়েই করবো।'


মারিয়া আপু একগাল হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, 'আচ্ছা। ঠিক আছে।'


মাথার মধ্যে এখন কেবল একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছে। শব্দটা হলো 'মা'। 


গল্প: মা।

লেখা: মাহ্ফুজা রহমান অমি। 

২৫-১২-২০২০

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?

 বিস্ময়ে আমি প্রায়ই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করতাম, 'তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?!'  সে হাসতো। ছেলেটা নিয়ম করে তার হৃদয়ভাঙ্গার গল্প শোনাতো আমায়।কী সুনিপুণ ভাবে জনৈক ভদ্রমহিলা তার প্রেমিক হৃদয়টিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিলো।আমি তার সব কথাই ভারী মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, খুব ভালোবাসতাম তো.. তাই বোধহয়। তার পুরনো দুঃখ, নতুন ব্যর্থতা,  সমসাময়িক দোটানা এবং হঠাৎ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা পাগলামি, প্রতিটা কথাই আমায় বাধ্য করতো নতুন করে তার প্রেমে পড়তে।  তবুও, সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমায় একটি নারীর কথা বলতো।একটি নারী, যে নারী আমি নই, যে নারীকে সে বরং ভালোবেসেছে, ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেছে, যে নারীকে নিয়ে সে জীবন কাটাতে চেয়েছিলো৷ এমন একটি নারী, যে আমি নই, যে কখনো আমি হবো না।  আমি সব শুনতাম, কখনো অন্যমনস্ক হয়ে, কখনো খুব বিরক্ত হয়ে, কখনোবা ভীষণ কান্না চেপে রেখে।  সে বলতো, আমি খুব সাবধানে চোখের জল মুছতাম, যাতে সে না বোঝে, যাতে সে না জানে।  আর ভাবতাম, এমন পুরুষকে যে নারী ভালোবাসতে পারেনি, সে কি এই ধুলোভরা মর্ত্যের কেউ, নাকি দেবী?  তাকে আমি পাইনি, নতুন করে তা বলার অপেক্ষা বোধ করি রাখে...

কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন !

 কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন ! ভালোবাসা একটি দুরন্ত ঘোড়া । কখন ঘোড়াটি চলতে শুরু, বোঝা যায় না । কোথায় যাচ্ছে, তাও বোঝা যায় না । তারপরেও মানুষ ভালোবাসার ফাঁদে পড়ে । একটু বেশি করে বললে মানুষ পড়তে চায় । ভালোবাসার শুরু পরিবারের বন্ধন থেকে । বড় হতে হতেই এটি পাওয়ার জন্যে মন মস্তিষ্ক উম্মুক্ত হয়ে থাকে । চাইলেই এটি চাওয়া থেকে যেমন আমরা বের হতে পারি না, তেমনি এটির ফাঁদে পড়ে বেরিয়ে যেতে একই মন আবার ছুটতে থাকে বিপরীত মুখে । এতো কিছুর পরেও মানুষ ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায় । কিন্তু কি করে বুঝবেন, আপনি সত্যিই কেউকে ভালোবাসেন ! একেকজনের পরিস্থিতির ধরন একেক রকম হলেও আপাত ভাবে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য থাকে, যা দেখে বুঝতে পারবেন আপনি ভালোবাসার জালে পড়ে গেছেন নাকি ভালবাসা আপনাকে জালে ফেলেছে !  এক. ভালোবাসার কোনো কারণ নেই, ভালোবাসার কোনো কারণ থাকতে নেই । ভালোবাসার কারণ খুঁজতে নেই । ভালোবাসেন, এটাই প্রধান এবং একমাত্র কারণ । কেন ভালোবাসেন, কারণ জেনে গেলে গেলে ওটা ভালোবাসা নয় । কারণ জেনে গেলে - হয় মানুষটিকে পছন্দ করেন অথবা মানুষটির সাথে সময়টি সাময়িক ভোগ করেন !  দুই. ভালোবাসার মানুষের চোখ...

বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২

  গল্পঃ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট-1 নিধিঃ ওই ছি ছি। এইটা কই আনলি, কেমন বাড়ি আমিঃ ওই মেডাম এইটা আপনার বাবার মতো এসি লাগানো বাড়ি না বুঝলেন এই খানে শুয়ে শুয়ে নিশ্চিন্তে চাঁদ দেখা যায়। দাঁরা আনছি। নিধিঃ ওই কি আনবি নাম বল। আমিঃ আগে আনি তারপর দেখিস। ও দাদু কই গেলা্… দাদুঃ কে রে ডাকে? আমিঃ দাদু আমি তন্নয়। দাদুঃ ওহহ কতদিন পর আসলি ভিতরে যা। আমিঃ যামুনা ১০০ টাকার ফাটাফাটি কয়টা নিয়া আসো তারাতারি। দাদুঃ হুম এই নে ধর। আমিঃ ধরো এই নাও টাকা। দাদাঃ এইটা কে রে আগে তো দেখি নাই। আমিঃ এইটা পরী। উঁরে যাওয়ার সময় আমারে দেইখা নেমে আসছে, আর আমি তোমার জিনিস খাওয়াইতে নিয়া আসছি হি হি। দাদুঃ এইখানে কেন নিয়ে আসছস, রাতে যায়গাটা ভালো না তুই তো জানিস। আমিঃ দুর তুমি টেনসন কইরো না আমি তো আছি নাকি। দাদুঃ আচ্ছা ভালো করে থাকিস। আমিঃ হুম হুম গেলাম। দাদুঃ কোন সমস্যা হলে আমার এই খানে আসিস। নিধিরে নিয়া চলে আসলাম নদীর ধারে বসে পড়লাম। আমিঃ নিধি বেগম এইবার চোখ বন্ধ করেন। নিধিঃ কেন? আমিঃ আরে করো না প্লিজ। নিধিঃ আচ্ছা। আমিঃ চোখ খুলেন এইবার। নিধিঃ ঐ কি এগুলা? আমিঃ সন্দেশ আমার অনেক ভালো লাগে,...