সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জীবনের গল্প: রোজগার

 যার স্বামীর আয় রোজগার নেই, তার কিসের ইদ আর সেহরিতে দুধকলা দিয়ে ভাত খাওয়া। বর্তমান দুধ কলার যা চড়া দাম। বারান্দা দিয়ে রান্না ঘরে যাওয়ার সময় শাশুড়ী মায়ের কথা গুলো মনে বিষাক্ত তীরের মতো করে বিঁধল। সত্যি তাই, মা ঠিকই বলেছে আমার স্বামী তো নিজের চাকরি হারিয়ে পুরোপুরি বেকার, একটাকাও সে রোজগার করতে পারে না। 

দু'জন এ বসে বসে খাচ্ছি সংসারে। রোজগার করবে কিভাবে, এতদিন একটা পা ভেঙে বিছানায় পরে ছিল মানুষটা। 

 


চুপ করো মনোয়ারা বলে বাবা ছোট্ট একটা ধমক দিলেন মাকে। চোখের পানি টলমল করছে আমার, একটু দাঁড়িয়ে ছিলাম কথা গুলো শুনে। আর এক মুহূর্ত সেখানে না থেকে ফিরে চলে আসলাম নিজের ঘরে। 


মানুষটা এই অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছে, মুখটা নিষ্পাপ লাগছে  দেখতে। আমিও খাটের এক কোণে বসে রইলাম। 

রান্না ঘর থেকে বড় ও ছোট ভাবি ডেকে পাঠালেন আমায়। 

ইফতার তৈরি করতে হবে, রাতের খাবার রান্না করতে হবে। মোট তেরো জন মানুষ আমাদের পরিবার এ। 


.

রান্না ঘরে ঢুকতেই বড় ভাবি আমায় দেখে অনেকটা তেড়ে আসলেন আমার কাছে, ভালো করে চোখ মুখ দেখে বললেন ছোট তুই কান্না করছিস। 

কি হয়েছে বল আমায়, ছোট ভাবিও কাজ ফেলে চলে আসলো আমার কাছে দু'জন এ জোড়াজুড়ি শুরু করলো আমার কি হয়েছে তা জানতে। 

মিথ্যা বললাম, বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে আমার আজ জীবনের এই প্রথম রমজান মা-বাবা কে ছেড়ে তাই খারাপ লাগছে। 

ও, এই জন্য মন খারাপ করে কাঁদতে হবে রে পাগলি! আমরা তো সবাই আছি এখানে, আমরা কি তোর কেউ নই নাকি রে ছোট। অবশ্য প্রথম প্রথম আমাদেরও খারাপ লাগতো এখন আর কিছু মনে হয় না। 


তুই আজ ঘরে যা, তোর মন খারাপ কাজ করতে হবে না আমি আর মেজো মিলে সব কাজ করে ফেলবো। ছোট ভাবিও বড় ভাবির কথায় সায় দিয়ে বললেন আমায় চলে আসতে। এলাম না, একা থাকলে বেশি খারাপ লাগবে জন্য ওদের সাথে রান্না করলাম। বাড়ির ছোট বউ বলে দায়িত্ব টা একটু কম আমার, সকলেই আদর করে আমায়। 

আজকাল ছোট পরিবার এর ভীড়ে এমন যৌথ পরিবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 


.


তারাবীহ'র নামাজ পড়ে শুয়ে আছি ভাবছি কি করা যায়, এখন পুরোপুরি সুস্থ মানুষটা। ডাক্তার বলেছেন, একদম স্বাভাবিক ভাবে চলতে ও দৌড়াতেও পারবেন তিনি। 

করোনা কালিন এই সময় চাকরি কি অত সহজে মিলবে, তাছাড়া এখন লকডাউন চলছে বড় বড় শহর গুলোতে বেশ কড়া ভাবে। যদিও আমরা গ্রামে থাকি, কিন্তু এখন গ্রাম গুলো আধুনিকতার ছোঁয়ায় বেশ উন্নত হয়েছে। 


তার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু একটা করবো আমরা, এভাবে আর কতো দিন রোজগার ব্যতীত থাকবো। মা ঠিকই বলেছেন, বসে বসে পরের উপর খাওয়া লজ্জাজনক। 


ভাবিদের সঙ্গে কথা বলে নিলাম কি করতে চাই, সাপোর্ট ও পেলাম। কোনো কাজও ছোট নয়, রোজগারের জন্য বৈধ ভাবে যেকোনো ছোট বড় কাজ এই সমান। 


গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করার জন্য আমি পিঁয়াজু ও বেগুনি তৈরি করে একটা বড় ডালিতে সাজায় দিলাম তাকে।

ডালি মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার বিক্রি করবে একজন বি.এ পাশ করা পুরুষ ব্যাপারটা একটু কেমন হয়ে গেলেও আমি সাহস দিলাম তাকে যে সে তো চুরি করছে না, তার অবস্থান থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। 


প্রথম দিন সব খাবার বিক্রি হয়ে গেলো, এ খবর বাবা আর ভাসুররা জানতে পেরে রেগে গেলেন। বললেন আহাবকে (আমার স্বামী) কিছু করতে হবে না আমরা তো আছি নাকি। 

তবুও তাদের ভাই বললো না ভাইয়া অনেকদিনই তো সেবা করলে আমার, এখন আমায় নিজেকে কিছু করতে দাও। আমরা কি সারাজীবন তোমাদের রোজগারে খাবো,এখন দুজন আছি যখন তিন-চার জন হবো তখনও কি তোমরা পুষবে আমাদের। তারচেয়ে ভালো আমি এখন থেকে কিছু করার চেষ্টা করি। 

কেউ আর কিছু না বলে চলে গেলো। 


.


দ্বিতীয় দিন খাবারের পাত্র নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসায় আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। 

আজ কি তাহলে খাবার বিক্রি হলো না, মানুষজন পছন্দ করে নি আমার বানানো ঘরোয়া স্বাদের ইফতার। 

কিন্তু, যখন শুনলাম সব খাবার বিক্রি হয়ে গেছে এবং অনেকে খাবার পায় নি। কাল থেকে আরও বেশি খাবার তৈরি করতে হবে শুনে খুশিতে মনটা ভরে উঠলো। 


বাবা ও ভাইয়ারা মিলে একটা কাচের গ্লাস দেওয়া ভ্যান কিনে দিলেন, এতে খাবার বহন করা সুবিধা হবে এবং পর্যাপ্ত খাবার বহন করা যাবে। 

এভাবে চলতে লাগলো আমাদের ছোট্ট ব্যবসা, দিন দিন চাহিদা বাড়তে থাকলো যেমন বাড়িতে তৈরি ইফতার এর তেমনি আশেপাশের মানুষজন নানান কুকথা বলতেও পিছপা হলো না। 

যখন বেকার ছিলো মানুষটা তখনও কথা বলতো বেকার, ভাইদের ঘাড়ে বসে খাচ্ছে এটাসেটা এখন বৈধ ভাবে রোজগার করতে শুরু করেছে সেখানেও তাদের সমস্যা। 


মানুষের কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করলাম। শাশুড়ী মা ও ভাবি রাও সাহায্য করতেন আমাদের যখন খুব চাপ পড়তো তখন। এখন বাড়িতে আমাদের বানানো খাবার দিয়ে ইফতার করা হয়। 


সীমিত লাভে রোজ আমাদের ব্যবসা বেশ ভালো চলতে লাগলো। বেশি সুবিধা হলো যখন কোনো ইফতার পার্টির ইফতার এর পুরো আয়োজন এর অর্ডার পেতে শুরু করি, নিজ গ্রাম ও পাশের গ্রাম থেকে মোট নয় টা অর্ডার পাওয়ার বেশ লাভবান হলাম।

 মনে মনে শাশুড়ী মা কে আমি অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই, ওনার জন্য আজ এই উদ্যোগ নিতে পেরেছি,  আস্তে আস্তে ব্যবসা টা অনেক বড় হবে স্বপ্ন দেখি আমরা সকলে। 


ইদের আর তিন-চার দিন বাকি, আলহামদুলিল্লাহ পরিবার এর সকলের জন্য আমাদের সামর্থ্য অনুসারে উপহার কেনা হয়েছে।


(সমাপ্ত) 


গল্পঃ রোজগার

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?

 বিস্ময়ে আমি প্রায়ই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করতাম, 'তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?!'  সে হাসতো। ছেলেটা নিয়ম করে তার হৃদয়ভাঙ্গার গল্প শোনাতো আমায়।কী সুনিপুণ ভাবে জনৈক ভদ্রমহিলা তার প্রেমিক হৃদয়টিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিলো।আমি তার সব কথাই ভারী মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, খুব ভালোবাসতাম তো.. তাই বোধহয়। তার পুরনো দুঃখ, নতুন ব্যর্থতা,  সমসাময়িক দোটানা এবং হঠাৎ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা পাগলামি, প্রতিটা কথাই আমায় বাধ্য করতো নতুন করে তার প্রেমে পড়তে।  তবুও, সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমায় একটি নারীর কথা বলতো।একটি নারী, যে নারী আমি নই, যে নারীকে সে বরং ভালোবেসেছে, ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেছে, যে নারীকে নিয়ে সে জীবন কাটাতে চেয়েছিলো৷ এমন একটি নারী, যে আমি নই, যে কখনো আমি হবো না।  আমি সব শুনতাম, কখনো অন্যমনস্ক হয়ে, কখনো খুব বিরক্ত হয়ে, কখনোবা ভীষণ কান্না চেপে রেখে।  সে বলতো, আমি খুব সাবধানে চোখের জল মুছতাম, যাতে সে না বোঝে, যাতে সে না জানে।  আর ভাবতাম, এমন পুরুষকে যে নারী ভালোবাসতে পারেনি, সে কি এই ধুলোভরা মর্ত্যের কেউ, নাকি দেবী?  তাকে আমি পাইনি, নতুন করে তা বলার অপেক্ষা বোধ করি রাখে...

কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন !

 কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন ! ভালোবাসা একটি দুরন্ত ঘোড়া । কখন ঘোড়াটি চলতে শুরু, বোঝা যায় না । কোথায় যাচ্ছে, তাও বোঝা যায় না । তারপরেও মানুষ ভালোবাসার ফাঁদে পড়ে । একটু বেশি করে বললে মানুষ পড়তে চায় । ভালোবাসার শুরু পরিবারের বন্ধন থেকে । বড় হতে হতেই এটি পাওয়ার জন্যে মন মস্তিষ্ক উম্মুক্ত হয়ে থাকে । চাইলেই এটি চাওয়া থেকে যেমন আমরা বের হতে পারি না, তেমনি এটির ফাঁদে পড়ে বেরিয়ে যেতে একই মন আবার ছুটতে থাকে বিপরীত মুখে । এতো কিছুর পরেও মানুষ ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায় । কিন্তু কি করে বুঝবেন, আপনি সত্যিই কেউকে ভালোবাসেন ! একেকজনের পরিস্থিতির ধরন একেক রকম হলেও আপাত ভাবে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য থাকে, যা দেখে বুঝতে পারবেন আপনি ভালোবাসার জালে পড়ে গেছেন নাকি ভালবাসা আপনাকে জালে ফেলেছে !  এক. ভালোবাসার কোনো কারণ নেই, ভালোবাসার কোনো কারণ থাকতে নেই । ভালোবাসার কারণ খুঁজতে নেই । ভালোবাসেন, এটাই প্রধান এবং একমাত্র কারণ । কেন ভালোবাসেন, কারণ জেনে গেলে গেলে ওটা ভালোবাসা নয় । কারণ জেনে গেলে - হয় মানুষটিকে পছন্দ করেন অথবা মানুষটির সাথে সময়টি সাময়িক ভোগ করেন !  দুই. ভালোবাসার মানুষের চোখ...

বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২

  গল্পঃ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট-1 নিধিঃ ওই ছি ছি। এইটা কই আনলি, কেমন বাড়ি আমিঃ ওই মেডাম এইটা আপনার বাবার মতো এসি লাগানো বাড়ি না বুঝলেন এই খানে শুয়ে শুয়ে নিশ্চিন্তে চাঁদ দেখা যায়। দাঁরা আনছি। নিধিঃ ওই কি আনবি নাম বল। আমিঃ আগে আনি তারপর দেখিস। ও দাদু কই গেলা্… দাদুঃ কে রে ডাকে? আমিঃ দাদু আমি তন্নয়। দাদুঃ ওহহ কতদিন পর আসলি ভিতরে যা। আমিঃ যামুনা ১০০ টাকার ফাটাফাটি কয়টা নিয়া আসো তারাতারি। দাদুঃ হুম এই নে ধর। আমিঃ ধরো এই নাও টাকা। দাদাঃ এইটা কে রে আগে তো দেখি নাই। আমিঃ এইটা পরী। উঁরে যাওয়ার সময় আমারে দেইখা নেমে আসছে, আর আমি তোমার জিনিস খাওয়াইতে নিয়া আসছি হি হি। দাদুঃ এইখানে কেন নিয়ে আসছস, রাতে যায়গাটা ভালো না তুই তো জানিস। আমিঃ দুর তুমি টেনসন কইরো না আমি তো আছি নাকি। দাদুঃ আচ্ছা ভালো করে থাকিস। আমিঃ হুম হুম গেলাম। দাদুঃ কোন সমস্যা হলে আমার এই খানে আসিস। নিধিরে নিয়া চলে আসলাম নদীর ধারে বসে পড়লাম। আমিঃ নিধি বেগম এইবার চোখ বন্ধ করেন। নিধিঃ কেন? আমিঃ আরে করো না প্লিজ। নিধিঃ আচ্ছা। আমিঃ চোখ খুলেন এইবার। নিধিঃ ঐ কি এগুলা? আমিঃ সন্দেশ আমার অনেক ভালো লাগে,...