সামান্য একটা ভুলের কারণে যখন বিয়ে বাড়ির সবার সামনে ষোল বছরের একটা কিশোরী মেয়ে আমার গালে থাপ্পড় মারল তখন আমারও মন চাইলো ওই সুন্দরী কিশোরী মেয়েটার দুই গালে দুইটা থাপ্পড় মারি। কিন্তু আমি পারলাম না কারণ বিয়েটা আমার বড় বোনের। আমি চাই না আমার কারণে আমার বোনের বিয়েতে কোন সমস্যা হোক। তাই আমি কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। খাওয়া শেষে যখন সবাইকে পায়েস দিচ্ছিলাম তখন ওই মেয়েগুলোর টেবিলে কেউ একজন পায়েস দিতে বলে। আমি তাদের টেবিলে যখন সবাইকে পায়েস দিতে যাব ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ আমাকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে আমার হাতে থাকা পায়েসের ডিসটা মেয়েটার ওপর গিয়ে পড়ে। আমি সরি বলার আগেই মেয়েটা আমাকে চড় মেরে বসে। আমার তখন প্রচন্ড রাগ হল,মনে হলো মেয়েটাকে কাছে টেনে এনে কয়েকটা থাপ্পড় মারি তারপর ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেই। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হল এটাতো আমারই বোনের বিয়ে। তাহলে আমাকে তো একটু নত হতেই হবে। তাই থাপ্পড় খেয়েও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেক মানুষ জড় হয়ে গেল। আপু চলে আসল,জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে? আমি সব বললাম। আপুর কথায় জানতে পারলাম এই মেয়েটা আপুর ননদ। যার সাথে আপুর বিয়ে হচ্ছে তাঁর ছোট বোন এই মেয়ে। অথচ কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত আমি মেয়েটাকে চিনতাম না। আপুর হবু হাসবেন্ড মেয়েটাকে সরি বলতে বলল। কিন্তু সে বলল না। যখন জোরে ধমক দিয়ে বলল,তখন নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেয়েটা আমাকে সরি বলল। তবে আমি বুঝলাম সে আমার ওপর এখনও রেগে আছে। সবাই চলে যাওয়ার পর আমি যখন তাকে বললাম।
"আমি আসলেই অনেক দুঃখিত,আমি জানতাম না আপনি আপুর ননদ আর আমি এটা ইচ্ছে করে করিনি। আসুন আপনাকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি।"
আমার কথার বিপরীতে মেয়েটা যখন আমাকে সরাসরি বলল।
"চুপ একদম চুপ। তুই সব ইচ্ছে করেই করেছিস। আমার কত সুন্দর জামাটা নষ্ট করে দিয়েছিস। এটার দাম জানিস কত? বাড়ি যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে এই নোংরা পোশাকে থাকতে হবে এর জন্য তুই দায়ী।"
আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। আমি তাঁর থেকে কম করে হলেও দুই থেকে তিন বছরের বড় হব আর সে আমাকে তুই করে বলছে। আমি কিছু বললাম না। কারণ আমি কোন ঝামেলায় যেতে চাচ্ছিলাম না।
আপুর বিয়ে হয়ে গেল,আপু আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাবে এটা মানতেই পারছি না। কারণ আমার আপন বলতে শুধু আমার বোনটাই আছে। আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন আমার আপুর বয়স ছিল দশ বছর৷ তখন আমার মা বুঝতে পারেন বাবা অন্য একজন নারীতে আসক্ত। মা জানতে পেরেছিলেন তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই তিনি এটা নিয়ে বাবার সাথে কখনো কথা কাটাকাটি করেননি। তবে তিনি মৃত্যুর আগেও আমাদের দুজনকে নিয়ে ভেবেছেন। মা জানতেন সৎ মা আমাদের দুভাইবোনকে কখনই ভালো চোখে দেখবে না। তাই মরার আগে আমাদের দুভাইবোনকে মামার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। বাবাও এটাতে জোর করেনি কারণ তিনিও একপ্রকার বাড়তি দায়িত্ব থেকে বেঁচে গিয়েছেন। আমি আর আমার বোন মামার বাড়িতেই মানুষ হয়েছি এতদিন। আপু চলে গেলেও আমি রয়ে গেলাম কারণ আমি ছেলে আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আমাকে জায়গা করে নিতে হবে কেউ জায়গা করে দিবে না।
আপু চলে যাওয়ার পর নিজেকে খুব একা অনুভব করলাম। মনে হলো আমার কেউ নেই৷ অথচ আপু প্রতিদিন আমাকে ফোন দিত আমার খোঁজ খবর নিত তবুও কেন জানি মনে হত আমি খুব একা। কয়েকমাস পর আমি কলেজ পাড় করে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। যে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম সেটা আপুর বাসা থেকে অনেকটা কাছে। আপুর বিয়েটা ছিল প্রেমের বিয়ে। তাঁর হাসবেন্ড তাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসত। তাই তিনি যা বলতেন সেটা আপুর হাসবেন্ড শুনতেন। আপু তাঁর হাসবেন্ডকে যখন আমার কথা বলেছিল,
"আমার ভাইটা যদি এই বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে তাহলে কি তোমার কোন সমস্যা হবে? অনার্স পাশ করতে পারলেই ও নিজের পথ খুুঁজে নিতে পারবে। চারটা বছর ও এখানে থেকে অনার্সটা শেষ করতে পারলে আমি তোমার কাছে সবসময় ঋণী থাকব। ওকে নিয়ে আমার অনেক চিন্তা হয়। আমি ছাড়া ওর কেউ নেই। এখন তো আমিও ওর কাছে থাকি না। অন্তত ও এখানে থাকলে আমি ওর মুখটা দেখতে পারব ওরও পড়াশোনাটা ভালোভালো হবে।"
তখন আপুর হাসবেন্ড বলেছিল।
"এটা আবার বলতে হবে? এটা তো তোমারই ঘর৷ এত বড় বাড়ি,এতগুলো রুম। শুধু তোমার ভাই কেন তোমার পুরো ফ্যামিলি থাকলেও আমার কোন সমস্যা হবে না। তুমি তোমার ভাইকে আসতে বল। আজ থেকে তোমার ভাই এখানেই থাকবে।"
আপুর কথামতো মত আমি তাঁর বাসায় চলো যাই। আপু আমাকে অনেক দিন পর দেখে খুশিতে জড়িয়ে ধরে। আপুর হাসবেন্ডও আমাকে দেখে অনেক খুশি হল। কিন্তু আপুর শ্বশুর শাশুড়ি আর ননদ মনে হয় আমাকে দেখে খুব একটা খুশি হতে পারল না। খুশি না হলেও তাদের কিছু করার নেই। কারণ আপুর হাসবেন্ড যা বলে তাই হয় এই বাড়িতে। আপু তাঁর ননদকে বলল।
"ইসরাত তুমি একটু আমার ভাইকে ওর থাকার রুমটা দেখিয়ে দাও।"
কথাটা বলে আপু চলে গেল,চলে যাওয়ার আগে বলল।
"তুই রুমে গিয়ে বস। আমি একটা কাজ শেষ করেই আসছি।"
আমি মেয়েটাকে চিনলেও নামটা জানতাম না। মেয়েটা আমার প্রতি এত বিরক্ত কেন বুঝলাম না। তাহলে কি সে ওইদিনের ঘটনাটা এখনও মনে রেখেছে কিন্তু আমি তো অনেক আগেই ভুলে গিয়েছি।
মেয়েটা যখন বলল।
"আপনি এই বাড়িতে এসেছেন কেন? আপনি বেশিদিন টিকতে পারবেন না এই বাড়িতে কারণ আপনাকে আমার পছন্দ না। আর যাকে আমার ভালো লাগে না তাকে আমি আমার চোখের সামনে দেখতে পারি না।"
এমন অহংকারী কথা শুনে আমার রাগ হল। রাগটাকে কন্ট্রোল করতে না পেরে বললাম।
"কেন এসেছি সেটা না হয় আপনার ভাবির কাছ থেকেই জেনে নিবেন। আর আমাকে তো আপনি বিয়ে করছেন না তাহলে পছন্দ অপছন্দের কথা কেন আসছে? আমার এই বাড়িতে থাকাটা যদি আপনার ভালো না লাগে তাহলে আপনার ভাই ভাবিকে বলুন তারা না বললে তো আর আমি এখানে জোর করে থাকব না,তারা চেয়েছে বলেই এখানে থাকব।"
হয়তো মেয়েটা আমার কাছ থেকে এমন কিছু শুনতে হবে আশা করেনি। তাই আমার দিকে জলন্ত চোখে তাকিয়ে বলল।
"আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এটা আপনারই বাড়ি। আমিও দেখব আপনি কতদিন এই বাড়িতে টিকতে পারেন। এমন কিছু করব আপনার বোন আপনাকে অপমান করে বের করে দিবে। শুধু অপেক্ষা করেন।"
কথাগুলো বলে মেয়েটা চলে গেল আমি তাঁর কথার আগাগোড়া কিছু বুঝতে পারলাম না।
নতুন মানুষ নতুন বাসা তবুও ভালো লাগছিল কারণ এর আগে এত বিলাসবহুল বাড়িতে কখনো থাকা হয়নি আমার। তাই ভালো লাগাটাও স্বাভাবিক। প্রথম কিছুদিন খুব ভালে গেল। কেউ কিছু করতে বলত না,কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হত না নিজের কাজের জন্য। যখন মনে যা চাইতো তাই করতে পারতাম। অথচ মামার বাসায় থাকতে সবাই কত কি করতে বলতে৷ কোন একটা কাজ পড়লেই আমার ডাক চলে আসত। মামাও যেন আমাকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেতেন না কিন্তু এখানে এমন না। আমার মনে হয় এখানে আমিই রাজা আমাকে কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আমার রাজত্বটা বেশিদিন টিকল না। আমি বুঝতে পারলাম আমার মতো মানুষের কোন রাজত্ব হতে পারে না।
কয়েকদিন পর হঠাৎ আপুর শাশুড়ি ডেকে নিয়ে বলল।
"বাসায় কেউ নেই,তোমার যদি কোন সমস্যা না থাকে তাহলে একটা কাজ করে দিতে পারবে?"
আমি বললাম,
"কি কাজ বলেন সমস্যা নেই আমি ফ্রি আছি।"
তখন সে বলল।
"আজকের বাজাটার করে দাও।"
সেদিন থেকেই শুরু তারপরে মাঝে মাঝেই আমাকে বাজার করত হত। আপুর শ্বশুর শাশুড়ি যখন যা বলত সেটা না করার মতো ক্ষমতাও আমার কাছে ছিল না। তাই কখনো তাদের দেওয়া কাজটাকে না করতাম না কষ্ট হলেও করতাম। কারণ আমি সবসময় চাইতাম আমার কারণে আমার বোনকে যেন কখনো সবার সামনে নিচু না হতে হয়। তাই তাদের দেওয়া কোন কাজকেই না বলতাম না আমি।
কয়েকদিন পরের কথা,
ইসরাতের রুমের পাশ দিয়ে আমাকে আমার রুমে যেত হত। হঠাৎ করে একদিন তাঁর রুমের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন আমি তাকে দেখে জাস্ট স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ মেয়েটা সদ্য গোসল ছেড়ে ভেজা চুলে টাওয়েল পড়ে অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। এর আগে কখনো কোন মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখিনি আমি। আজকে না চাইতেও যখন দেখে ফেললাম তখনও বুঝতে পারিনি আমার জন্য কি অপেক্ষা করছিল। আমাকে দেখেই ইসরাত বলল।
"একটু ওয়েট কর তুই দ্যাখ তোর কি অবস্থা করি আমি।"
কথাটা বলেই সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল আমি শুধু অবাক চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম৷ আমি তাঁর চিৎকার করার কারণটা এখনও বুঝতে পারলাম না। তাহলে কি সে আমাকে সবার সামনে খারাপ বানানোর জন্য এমন করছে? কিন্তু আমি তো তাকে ইচ্ছে করে এই অবস্থায় দেখিনি সেই তো দরজা খোলা রেখেছিল। মানুষ কি আসলেই এমনটা করতে পারে?
প্রতিশোধময় ভালোবাসা
পর্ব-১

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন