প্রথম যখন আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আমাকে দেখতে আসেন তখন মনে হয়েছিল এতো ভালো মানুষ দুনিয়াতে আর দ্বিতীয় নেই। বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হয়েছিলো। প্রথম দুই বছর আমার স্বামীকে মনে হয়েছিলো ফেরেশতা। মানে এতো ভালো মানুষ কী করে হয় তা ভাবতাম।
আমার আম্মুকে মাঝে মাঝে বলতাম তুমি মানুষের সাথে না এক ফেরেশতার সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছো। আম্মু হাসতো আর বলতো আল্লাহর কাছে যেন শুকরিয়া করি।
হয়তো শুকরিয়া একটু কম আদায় করেছিলাম যার জন্য আমার প্রথম সন্তান হওয়ার পরেই সবার আসল চেহারা দেখা শুরু করসিলাম। যদিও শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আর নোনাশের চেহারা আরও আগেই দেখে ফেলেছিলাম। কিন্তু তবুও যখন আমার প্রথম ছেলে হলো তখন আরও বেশি করে যেন সবার নতুন রূপ দেখছিলাম।
প্রথম ছেলের নাম রেখেছিলাম সাকিন। যার সূত্র ধরে শুরু হয়েছিলো রিদু মানে আমার স্বামীর অত্যাচার। নানারকম অত্যাচার সহ্য করেছি। এমন সময় ও গেসে যখন সারাদিন কাজ করে খেতে যাবো তখনও মাপা ভাতটুকু ছাড়া বেশতি কিছুই কপালে জুটতো না। জয়েন্ট ফ্যামিলি ছিল তবু আমি কখনো নারাজ হতাম না, মানিয়ে চলার চেষ্টা করতাম।
বড় হয়েছি খুব সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি তে তা নয় কিন্তু তাই বলে কখনো খাওয়াদাওয়ার কষ্ট করতে হয় নি। সবসময় আমার আব্বু পরিপাটি করে রাখতো একমাত্র মেয়ে বলে কথা। ফ্যামিলি অনেকটা কনজার্ভেটিভ ছিলো বলে বাহিরে তেমন ছেলে বন্ধু ছিল না কিন্তু পড়ালেখা সম্পূর্ণ করেই বিয়ে দিয়েছে। বিয়েটা ভালো পরিবারে দিয়েছে বলে জানে আমার আম্মু-আব্বু এমনকি আমিও তাই জানতাম।
কিন্তু কী যে হলো সাকিনের জন্মের পরে ধীরে ধীরে সব উলটপালট হতে শুরু করলো। শ্বশুর বাড়িতে অত্যাচার এর মাত্রা এতোই শুরু হলো যে আমার ছোট বাচ্চাটাকে পর্যন্ত তারা ভালো মতো দেখতো না। বাড়ির বড় বউ বলে কথা সব কাজ নিজেকেই করতে হতো সেটা সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমার বাচ্চাটা কে ও তারা ধরতো না। সারাদিন কান্না করতো।
বলেছিলাম একটা মেয়ে নিয়ে আসলে আমার বাচ্চা টা মেয়েটার কাছে থাকলে আমি বাসার কাজগুলো করতে পারতাম। এই কথা শুনে তুমুল ঝগড়াঝাটি শুরু করে দিয়েছিলো। তাই আর কিছু বলিনি। রিদুকে এগুলা বললে উলটা আমার উপর চিল্লানো শুরু করতো। এজন্য আর বেশি কিছু বলতাম না।
এভাবে একদিন আম্মু এসে আমাকে দেখে অবাক হয়ে গেসিলো একদম। আম্মু সেদিন আমাকে নিয়ে বাসায় চলে গেসিলো। রিদু এই বিষয় নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করেছিলো যা বলার মতো নয়। এরপর থেকেই আমি আর সাকিন আম্মুর কাছে থাকতাম।
প্রায় সাড়ে চার মাস পরে এসে রিদু আমাদের নিয়ে যেতে এসেছিলো। আম্মু আমাকে দিবে না তাও আমি বুঝিয়ে রিদুর সাথে শ্বশুর বাড়ি আসলাম। এই আসাই যে আমার কত বড় ভুল ছিল তা আজ বুঝতে পারি। শ্বশুর বাড়িতে প্রতিদিন এই নিয়ে কথা শুনাতো। আমি সব মানিয়ে নিতে প্রচুর চেষ্টা করতাম।
দুই বছর পর যখন আমার হিয়া জন্মালো তখন রিদু একটু নরম হতে শুরু করলো কিন্তু তবুও শ্বশুর বাড়ির কথা শুনে মাঝে মাঝে পরিবর্তন হয়ে যেতো। একদিন খুব কথা কাটাকাটি করে রিদু নিজেই আমাকে আর আমাদের দুই সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে চলে আসে। আমরা বাসা ভাড়া নেই। সেই থেকে শুরু এখনো ভাড়া বাসাতেই থাকি।
মাঝেমধ্যে মনে হয় কেন রিদুর সাথে বিয়ে হলো। সাকিন আর হিয়া বড় হয়ে গেসে ঠিকই কিন্তু তাদের বাবা নামমাত্র। ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়া তো দূরে একবার জিজ্ঞাসা করেও দেখতো না। সবকিছু ভেবেচিন্তে একটা ব্যবসা শুরু করেছিলাম । যেখানে লাভ-লোকসান দুইটাই হতো। তবে লোকসান বেশি হতো। তাও আমি পিছু হটি নি চালিয়ে গেসিলাম। কি করবো সংসার চালানো লাগবে। ধীরে ধীরে আমি ব্যবসায় এর আগাগোড়া বুঝে উঠি। কিন্তু সেটা বুঝতেও প্রায় দুই তিন বছর লেগেছিলো।
রিদুকে কিছু করতে বললে শুনতো না, কথা বেশি বাড়লে নিজের বাবা মার কাছে চলে যেতো। কয়দিন থেকে আবার চলে আসতো। আমার বুক ছিড়ে যেতো তাও আমি আমার আম্মু কে কিছু বলতাম না। সবসময় দেখাতাম খুব সুখে আছি। এভাবেই নিজের দুঃখ সব লুকিয়ে ক্যারিয়ারে মনযোগ দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ কয়েক বছরের মধ্যেই ভালো ফলাফল পেলাম।
এখন আমার ছেলে মেয়ে দুইটাই মাশাআল্লাহ বড় হয়ে গেসে, আমার রত্ন এরাই। এরা বুঝে তাদের বাবা কিছুই না তাদের জন্য কিন্তু তবু কখনো অসম্মান করতে দেই নি। রিদু এখনো অত্যাচার করে আমার ছেলে মেয়ের সামনেই। ওরা কিছু বলে না শুধু কান্না করে। মাঝে মাঝে আমি নিজেই ভেঙে পড়ি কীভাবে এগিয়ে যাবো। আবার মাঝেমধ্যে নিজের শক্তি অনুভব করি। আমার টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ সংসার চলে এখানে রিদুর অত্যাচার সহ্য না করলেও তেমন কিছুই হবে না। শুধু ছেলে মেয়ের কথা ভেবে এখনো এক ছাদের নিচে আছি।
চাইলেই সম্ভব সব ছেড়ে দিয়ে আমার সন্তান নিয়ে সুখে থাকার কিন্তু তা করলে হয়তো বাহ্যিক শান্তি পাবো, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তো তেরো বছর আগে যাকে কবুল বলে ভালোবাসা শুরু করেছিলাম তাকে ভুলার অশান্তি থেকেই যাবে। আজও ভালোবাসি ততোটাই যতোটা প্রথমে বাসতাম। শুধু মানসিক পরিবর্তন এসেছে আমার রিদুকে চিনতে আমি নিজেই ভুল করেছিলাম।
কষ্ট হয় সংসার, সন্তান, স্বামী, ব্যবসায় সব চালিয়ে নিতে। তবুও আমাদের মতো নারীদের পিছনে তাকালে চলে না। এই জীবনকেই আমরা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়েছি।
সংসার
লেখাঃ Meherun Falguni

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন