সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জীবনের গল্প- সংসার!

 প্রথম যখন আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আমাকে দেখতে আসেন তখন মনে হয়েছিল এতো ভালো মানুষ দুনিয়াতে আর দ্বিতীয় নেই। বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হয়েছিলো। প্রথম দুই বছর আমার স্বামীকে মনে হয়েছিলো ফেরেশতা। মানে এতো ভালো  মানুষ কী করে হয় তা ভাবতাম। 


আমার আম্মুকে মাঝে মাঝে বলতাম তুমি মানুষের সাথে না এক ফেরেশতার সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছো। আম্মু হাসতো আর বলতো আল্লাহর কাছে যেন শুকরিয়া করি।


হয়তো শুকরিয়া একটু কম আদায় করেছিলাম যার জন্য আমার প্রথম সন্তান হওয়ার পরেই সবার আসল চেহারা দেখা শুরু করসিলাম। যদিও শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আর নোনাশের চেহারা আরও আগেই দেখে ফেলেছিলাম। কিন্তু তবুও যখন আমার প্রথম ছেলে হলো তখন আরও বেশি করে যেন সবার নতুন রূপ দেখছিলাম। 


প্রথম ছেলের নাম রেখেছিলাম সাকিন। যার সূত্র ধরে শুরু হয়েছিলো রিদু মানে আমার স্বামীর অত্যাচার। নানারকম অত্যাচার সহ্য করেছি। এমন সময় ও গেসে যখন সারাদিন কাজ করে খেতে যাবো তখনও মাপা ভাতটুকু ছাড়া বেশতি কিছুই কপালে জুটতো না। জয়েন্ট ফ্যামিলি ছিল তবু আমি কখনো নারাজ হতাম না, মানিয়ে চলার চেষ্টা করতাম। 


বড় হয়েছি খুব সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি তে তা নয় কিন্তু তাই বলে কখনো খাওয়াদাওয়ার কষ্ট করতে হয় নি। সবসময় আমার আব্বু পরিপাটি করে রাখতো একমাত্র মেয়ে বলে কথা। ফ্যামিলি অনেকটা কনজার্ভেটিভ ছিলো বলে বাহিরে তেমন ছেলে বন্ধু ছিল না কিন্তু পড়ালেখা সম্পূর্ণ করেই বিয়ে দিয়েছে। বিয়েটা ভালো পরিবারে দিয়েছে বলে জানে আমার আম্মু-আব্বু এমনকি আমিও তাই জানতাম। 


কিন্তু কী যে হলো সাকিনের জন্মের পরে ধীরে ধীরে সব উলটপালট হতে শুরু করলো। শ্বশুর বাড়িতে অত্যাচার এর মাত্রা এতোই শুরু হলো যে আমার ছোট বাচ্চাটাকে পর্যন্ত তারা ভালো মতো দেখতো না। বাড়ির বড় বউ বলে কথা সব কাজ নিজেকেই করতে হতো সেটা সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমার বাচ্চাটা কে ও তারা ধরতো না। সারাদিন কান্না করতো। 


বলেছিলাম একটা মেয়ে নিয়ে আসলে আমার বাচ্চা টা মেয়েটার কাছে থাকলে আমি বাসার কাজগুলো করতে পারতাম। এই কথা শুনে তুমুল ঝগড়াঝাটি শুরু করে দিয়েছিলো। তাই আর কিছু বলিনি।  রিদুকে এগুলা বললে উলটা আমার উপর চিল্লানো শুরু করতো। এজন্য আর বেশি কিছু বলতাম না।


 এভাবে একদিন আম্মু এসে আমাকে দেখে অবাক হয়ে গেসিলো একদম। আম্মু সেদিন আমাকে নিয়ে বাসায় চলে গেসিলো। রিদু এই বিষয় নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করেছিলো যা বলার মতো নয়। এরপর থেকেই আমি আর সাকিন আম্মুর কাছে থাকতাম। 


প্রায় সাড়ে চার মাস পরে এসে রিদু আমাদের নিয়ে যেতে এসেছিলো। আম্মু আমাকে দিবে না তাও আমি বুঝিয়ে রিদুর সাথে শ্বশুর বাড়ি আসলাম। এই আসাই যে আমার কত বড় ভুল ছিল তা আজ বুঝতে পারি। শ্বশুর বাড়িতে প্রতিদিন এই নিয়ে কথা শুনাতো। আমি সব মানিয়ে নিতে প্রচুর চেষ্টা করতাম। 


দুই বছর পর যখন আমার হিয়া জন্মালো তখন রিদু একটু নরম হতে শুরু করলো কিন্তু তবুও শ্বশুর বাড়ির কথা শুনে মাঝে মাঝে পরিবর্তন হয়ে যেতো। একদিন খুব কথা কাটাকাটি করে রিদু নিজেই আমাকে আর আমাদের দুই সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে চলে আসে। আমরা বাসা ভাড়া নেই। সেই থেকে শুরু এখনো ভাড়া বাসাতেই থাকি। 


মাঝেমধ্যে মনে হয় কেন রিদুর সাথে বিয়ে হলো। সাকিন আর হিয়া বড় হয়ে গেসে ঠিকই কিন্তু তাদের বাবা নামমাত্র। ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়া তো দূরে একবার জিজ্ঞাসা করেও দেখতো না। সবকিছু ভেবেচিন্তে একটা ব্যবসা শুরু করেছিলাম । যেখানে লাভ-লোকসান দুইটাই হতো। তবে লোকসান বেশি হতো। তাও আমি পিছু হটি নি চালিয়ে গেসিলাম। কি করবো সংসার চালানো লাগবে। ধীরে ধীরে আমি ব্যবসায় এর আগাগোড়া বুঝে উঠি। কিন্তু সেটা বুঝতেও প্রায় দুই তিন বছর লেগেছিলো।


রিদুকে কিছু করতে বললে শুনতো না, কথা বেশি বাড়লে নিজের বাবা মার কাছে চলে যেতো। কয়দিন থেকে আবার চলে আসতো। আমার বুক ছিড়ে যেতো তাও আমি আমার আম্মু কে কিছু বলতাম না। সবসময় দেখাতাম খুব সুখে আছি। এভাবেই নিজের দুঃখ সব লুকিয়ে ক্যারিয়ারে মনযোগ দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ কয়েক বছরের মধ্যেই ভালো ফলাফল পেলাম।


এখন আমার ছেলে মেয়ে দুইটাই মাশাআল্লাহ বড় হয়ে গেসে, আমার রত্ন এরাই। এরা বুঝে তাদের বাবা কিছুই না তাদের জন্য কিন্তু তবু কখনো অসম্মান করতে দেই নি। রিদু এখনো অত্যাচার করে আমার ছেলে মেয়ের সামনেই। ওরা কিছু বলে না শুধু কান্না করে। মাঝে মাঝে আমি নিজেই ভেঙে পড়ি কীভাবে এগিয়ে যাবো। আবার মাঝেমধ্যে নিজের শক্তি অনুভব করি। আমার টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ সংসার চলে এখানে রিদুর অত্যাচার সহ্য না করলেও তেমন কিছুই হবে না। শুধু ছেলে মেয়ের কথা ভেবে এখনো এক ছাদের নিচে আছি। 


চাইলেই সম্ভব সব ছেড়ে দিয়ে আমার সন্তান নিয়ে সুখে থাকার কিন্তু তা করলে হয়তো বাহ্যিক শান্তি পাবো, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তো তেরো বছর আগে যাকে কবুল বলে ভালোবাসা শুরু করেছিলাম তাকে ভুলার অশান্তি থেকেই যাবে। আজও ভালোবাসি ততোটাই যতোটা প্রথমে বাসতাম। শুধু মানসিক পরিবর্তন এসেছে আমার রিদুকে চিনতে আমি নিজেই ভুল করেছিলাম।



কষ্ট হয় সংসার, সন্তান, স্বামী, ব্যবসায় সব চালিয়ে নিতে। তবুও আমাদের মতো নারীদের পিছনে তাকালে চলে না। এই জীবনকেই আমরা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়েছি।


সংসার

লেখাঃ Meherun Falguni

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?

 বিস্ময়ে আমি প্রায়ই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করতাম, 'তোমাকেও কেউ ভালো না বেসে পারে?!'  সে হাসতো। ছেলেটা নিয়ম করে তার হৃদয়ভাঙ্গার গল্প শোনাতো আমায়।কী সুনিপুণ ভাবে জনৈক ভদ্রমহিলা তার প্রেমিক হৃদয়টিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিলো।আমি তার সব কথাই ভারী মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, খুব ভালোবাসতাম তো.. তাই বোধহয়। তার পুরনো দুঃখ, নতুন ব্যর্থতা,  সমসাময়িক দোটানা এবং হঠাৎ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা পাগলামি, প্রতিটা কথাই আমায় বাধ্য করতো নতুন করে তার প্রেমে পড়তে।  তবুও, সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমায় একটি নারীর কথা বলতো।একটি নারী, যে নারী আমি নই, যে নারীকে সে বরং ভালোবেসেছে, ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেছে, যে নারীকে নিয়ে সে জীবন কাটাতে চেয়েছিলো৷ এমন একটি নারী, যে আমি নই, যে কখনো আমি হবো না।  আমি সব শুনতাম, কখনো অন্যমনস্ক হয়ে, কখনো খুব বিরক্ত হয়ে, কখনোবা ভীষণ কান্না চেপে রেখে।  সে বলতো, আমি খুব সাবধানে চোখের জল মুছতাম, যাতে সে না বোঝে, যাতে সে না জানে।  আর ভাবতাম, এমন পুরুষকে যে নারী ভালোবাসতে পারেনি, সে কি এই ধুলোভরা মর্ত্যের কেউ, নাকি দেবী?  তাকে আমি পাইনি, নতুন করে তা বলার অপেক্ষা বোধ করি রাখে...

কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন !

 কি করে বুঝবেন আপনি কেউ’কে ভালোবাসেন ! ভালোবাসা একটি দুরন্ত ঘোড়া । কখন ঘোড়াটি চলতে শুরু, বোঝা যায় না । কোথায় যাচ্ছে, তাও বোঝা যায় না । তারপরেও মানুষ ভালোবাসার ফাঁদে পড়ে । একটু বেশি করে বললে মানুষ পড়তে চায় । ভালোবাসার শুরু পরিবারের বন্ধন থেকে । বড় হতে হতেই এটি পাওয়ার জন্যে মন মস্তিষ্ক উম্মুক্ত হয়ে থাকে । চাইলেই এটি চাওয়া থেকে যেমন আমরা বের হতে পারি না, তেমনি এটির ফাঁদে পড়ে বেরিয়ে যেতে একই মন আবার ছুটতে থাকে বিপরীত মুখে । এতো কিছুর পরেও মানুষ ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায় । কিন্তু কি করে বুঝবেন, আপনি সত্যিই কেউকে ভালোবাসেন ! একেকজনের পরিস্থিতির ধরন একেক রকম হলেও আপাত ভাবে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য থাকে, যা দেখে বুঝতে পারবেন আপনি ভালোবাসার জালে পড়ে গেছেন নাকি ভালবাসা আপনাকে জালে ফেলেছে !  এক. ভালোবাসার কোনো কারণ নেই, ভালোবাসার কোনো কারণ থাকতে নেই । ভালোবাসার কারণ খুঁজতে নেই । ভালোবাসেন, এটাই প্রধান এবং একমাত্র কারণ । কেন ভালোবাসেন, কারণ জেনে গেলে গেলে ওটা ভালোবাসা নয় । কারণ জেনে গেলে - হয় মানুষটিকে পছন্দ করেন অথবা মানুষটির সাথে সময়টি সাময়িক ভোগ করেন !  দুই. ভালোবাসার মানুষের চোখ...

বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২

  গল্পঃ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট ২ বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা পার্ট-1 নিধিঃ ওই ছি ছি। এইটা কই আনলি, কেমন বাড়ি আমিঃ ওই মেডাম এইটা আপনার বাবার মতো এসি লাগানো বাড়ি না বুঝলেন এই খানে শুয়ে শুয়ে নিশ্চিন্তে চাঁদ দেখা যায়। দাঁরা আনছি। নিধিঃ ওই কি আনবি নাম বল। আমিঃ আগে আনি তারপর দেখিস। ও দাদু কই গেলা্… দাদুঃ কে রে ডাকে? আমিঃ দাদু আমি তন্নয়। দাদুঃ ওহহ কতদিন পর আসলি ভিতরে যা। আমিঃ যামুনা ১০০ টাকার ফাটাফাটি কয়টা নিয়া আসো তারাতারি। দাদুঃ হুম এই নে ধর। আমিঃ ধরো এই নাও টাকা। দাদাঃ এইটা কে রে আগে তো দেখি নাই। আমিঃ এইটা পরী। উঁরে যাওয়ার সময় আমারে দেইখা নেমে আসছে, আর আমি তোমার জিনিস খাওয়াইতে নিয়া আসছি হি হি। দাদুঃ এইখানে কেন নিয়ে আসছস, রাতে যায়গাটা ভালো না তুই তো জানিস। আমিঃ দুর তুমি টেনসন কইরো না আমি তো আছি নাকি। দাদুঃ আচ্ছা ভালো করে থাকিস। আমিঃ হুম হুম গেলাম। দাদুঃ কোন সমস্যা হলে আমার এই খানে আসিস। নিধিরে নিয়া চলে আসলাম নদীর ধারে বসে পড়লাম। আমিঃ নিধি বেগম এইবার চোখ বন্ধ করেন। নিধিঃ কেন? আমিঃ আরে করো না প্লিজ। নিধিঃ আচ্ছা। আমিঃ চোখ খুলেন এইবার। নিধিঃ ঐ কি এগুলা? আমিঃ সন্দেশ আমার অনেক ভালো লাগে,...